মুসলিম আগমনের আদিপর্বে মুসলিম সংস্কৃতির সাথে হিন্দু সামাজিক রীতি

 এতকাল তেমন ছিল না| পরে বখতিয়ারের মুদ্রা বলে শনাক্ত করা মােহাম্মদ বিন সাম নামাঙ্কিত গৌড় বিজয়ের স্মারক মুদ্রা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| ১২০৪ সালে নদীয়া বিজয়ের পরের বছর বখতিয়ার লখনৌতি বা গৌড় দখল করেন| তিনি শাসন ব্যবস্থার সুবিধার জন্য তার অধিকারকৃত পুরাে অঞ্চলগুলােকে কয়েকটি ইকতা বা প্রদেশে বিভক্ত করেছিলেন| সামাজিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বখতিয়ার খলজি মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করেন|| । বখতিয়ার খলজির হাত ধরে বাংলার প্রচলিত সংস্কৃতির সাথে বিদেশী সংস্কৃতির সংমিশ্রণে নতুন ধারার চর্চার যে পথ রচিত হলাে তা চলেছিল দীর্ঘদিন| এরপর বখতিয়ার খলজির মৃত্যুর পর তার অনুসারী খলজিরা নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে শাসন ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়| তারপর ১২২৭ সালের দিকে সুলতান শাসস উদ্দিন ইলতুতমিশের বড় ছেলে নাসির উদ্দিন মাহমুদ গিয়াস উদ্দিন ইওয়াজ খলজিকে পরাজিত ও হত্যা করে বাংলা দখল করেন| ১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবনের মৃত্যু পর্যন্ত বাংলা দিলীর অধীনে ছিল| এই অবস্থায় লখনৌতির কোনাে কোনাে শাসক স্বাধীনতা ঘােষণার চেষ্টা করলেও তাদের

সেই চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়| পরবর্তিকালে বলবনের মৃত্যুর পর বুগরা খানের পুত্র কায়কাউস রুকন উদ্দীন কায়কাউস উপাধি ধারণ করে অনেকটা দিলি-র সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলা শাসন করতে থাকেন| এরপর বাংলার শাসন ক্ষমতায় আসেন শাসস উদ্দিন ফিরুজ শাহ।

বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা ঘটে ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের স্বাধীনতা ঘােষণার মধ্যদিয়ে| যা মােগল অধিকারে পূর্ব পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল| পরবর্তীকালে বাংলার শাসন কাঠামােতে কয়েকজন বিখ্যাত সুলতানের আবির্ভাব লক্ষ করা যায়| শামস উদ্দিন ইলিয়াস শাহ, সিকান্দর শাহ, গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম| পরবর্তীকালে হিন্দু রাজা গণেশ বাংলার শাসন ক্ষমতায় কিছুদিনের জন্য অধিষ্ঠিত থাকলেও জৌনপুরের ইব্রাহীম শকি হস্তক্ষেপে গণেশ পরাভূত হন| এরপর পরবর্তী ইলিয়াসশাহী বংশের শাসনকালে আমরা রুকন উদ্দীন বারবক শাহ, শামস উদ্দিন ইউসুফ শাহ, জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহ প্রমুখ সুলতানের শাসনের পর হাবশী দাস বংশীয় শাসনের ফলে বাংলার শাসনকাঠামাে অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে| এরপর হুসেন শাহী

বংশের চারজন সুলতান রাজত্ব করেন| তাদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ও নাসির উদ্দিন নুসরত শাহ| শাসক হিসেবে তাঁরা তাঁদের খ্যাতি ছড়িয়ে দেন| আমাদের প্রচলিত ইতিহাস গ্রন্থে রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ সহজলভ্য বলে বর্তমান লেখাগুলােতে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের কাহিনী বাদ দিয়ে সমাজ সংস্কৃতিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে| এর ধারবাহিক পরবর্তী পর্বে বাংলায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠায় সুফিদের ভূমিকা কেমন ছিল, শ্রী চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলন কিভাবে বাংলার হিন্দু সমাজকে জাগ্রত করাতে পেরেছিল, শ্রী চৈতন্য হিন্দুব্রাহ্মণ্যবাদের যাঁতাকল ভেঙে বের হয়ে এসে কিভাবে ভক্তি আন্দেলনকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন তা আলােচিত হবে|

মুসলিম আগমনের আদিপর্বে মুসলিম সংস্কৃতির সাথে হিন্দু সামাজিক রীতি ও প্রথার সংমিশ্রণের ফলে একটি নতুন ধারার সমাজ কাঠামাে গড়ে উঠতে দেখা যায়| এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে| তা হল গ্রহণ বর্জনের উদারতা| হিন্দু ধর্মে ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র আধিপত্য আর শ্রেণি ভেদের বিপরীতে

মুসলিম সমাজের সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন হিন্দু সমাজকেও আলােড়িত করে| অন্যদিকে ভারতের বৈচিত্রময় হিন্দু সংস্কৃতি মুসলিম শাসকবর্গসহ অন্যান্যদের প্রভাবিত করে| রাজদণ্ড ধারণের পর মুসলিম শাসকবগেৱ সভাসদ, রাজদরবারের কর্মচারী, অমাত্যসহ নানাপদ অলংকৃত করার মাধ্যমে হিন্দু জনগােষ্ঠী মুসলিম শাসকদের সংস্পর্শে আসার সুযােগ পায়| অন্যদিকে মুসলিম জনগােষ্ঠীর প্রতিবেশী হিসেবেও হিন্দুগণ মুসলমানদের সংস্পর্শে আসেন| বাস্তবতার নিরীখে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় শাসকগােষ্ঠী শাসিত শ্রেণিকে তাদের আদর্শ, সংস্কৃতি আর জীবনধারার নানাদিকে প্রভাবিত করে থাকেন| উদাহরণ হিসেবে বৃটিশ শাসন আমলে এদেশীয় সংস্কৃতির উপর নানামুখী প্রভাবের কথা বলা যেতে পারে| একই ভাবে ভারতে মুসলিম শাসকগােষ্ঠীর রাজদণ্ড ধারণের পর এদেশীয় হিন্দুদের অনেকেই তাদের বৈচিত্রময় সংস্কৃতির দরা প্রভাবিত হন| তৎকালীন কবি জয়ানন্দের বিবরণ হতে এর সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়| মধ্যযুগের কবি জয়ানন্দ লিখেছেন ‘জগাই ও মাধাই নামক দুইজন ব্রাহ্মণ ফারসি কবিতা আবৃত্তি করতাে এবং মাংস ভক্ষণ করতাে| তিনি আফসােস করে বলেছেন ‘বিধবা রমনীরা

Leave a Comment